আমি বাপ্পাদিত্য মুখার্জি। আজ মহালয়া সকালবেলা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ শোনার পর, একটু মর্নিং ওয়ার্কে গিয়েছিলাম , বাড়িতে এসে ড্রয়িং রুমে কফি খেতে খেতে খবরের কাগজটা পড়ছিলাম।খবরের কাগজটা যখন পড়ছিলাম, তখন হঠাৎই খুব চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিলাম, তাই আমি ব্যালকনি থেকে একটু কানটা বাড়িয়ে সোনার চেষ্টা করছিলাম যে কি হচ্ছে? বেরিয়ে দেখি যে আমার পাশের কমপ্লেক্সে ভীড় হয়ে আছে। তাই তাড়াতাড়ি কফি খাওয়াটা শেষ করে আমি নিচে নেমে গেলাম। গিয়ে দেখি যে প্রচুর ভিড়, কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না, তারপর একজনকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে দাদা, শুনলাম শ্যামবাবুর একটা হীরে চুরি গেছে, যার দাম ৫০ কোটি টাকা। আমি তো শুনে হতভঙ্গ হয়ে গেলাম এবার কি করব বুঝতে পারলাম না, তাই ঘরে চলে এলাম, এসে আমি জাস্ট ঘরটা গোছাচ্ছিলাম কারণ অফিসে বেরোতে হবে। দেখি আমার ঘরের কলিং বেলটা ক্রমশ বেজেই যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুললাম, খুলে দেখি আমার বন্ধু প্রমথ দাঁড়িয়ে আছে পুরো ঘেমে স্নান অবস্থায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? ও বলল যে আমার রুমমেট সমরেশের মামা মারা গেছে। সত্যিই অবাক কাণ্ড, একটু আগে একজনের বাড়িতে হিরে চুরি গেলো, আর আমার নিজের বন্ধুর ফ্ল্যাটে একজন মারা গেছে। আমি আর প্রমথ তাড়াতাড়ি নিচে গেলাম, গিয়ে দেখলাম সমরেশের মামা মৃত অবস্থায় টেবিলের ওপর শুয়ে আছে আর তার সামনে একটি টাইপ রাইটার তাতে কিছু লেখা আছে। আমি গিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ চলে এলো, এসে এদিক ওদিক দেখাশোনা করছে, ঠিক কি হয়েছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে। এরকম দেখতে দেখতে পুলিশের একজন কনস্টেবল সেই টাইপ রাইটার থেকে কাগজটা বের করতে যাবে, হঠাৎতই পেছন থেকে একটা গম্ভীর গলায় বলে উঠল দাঁড়ান কিচ্ছু ধরবেন না। আমি, প্রমথ সবাই পেছনে ঘুরে তাকালাম, আর অবাক হয়ে গেলাম। সুট বুট পরা হাতে সিগারেট নিয়ে ফেলুদা দাঁড়িয়ে আছে। আমরা দেখে তো অবাক সঙ্গে ছিল জটায়ু। ফেলুদা এক পা করে প্রমথর মামার দিকে হেঁটে এলো। এসে সেই টাইপের লেখার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলল এখানে কিছু একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। ফেলুদাকে এই রহস্যের সমাধান করতে দেখে ভেবেছিলাম যে ফেলুদাই দুটো রহস্যের সমাধান করবে। কি তোমরাও তাই ভাবছো তো? ফেলুদা এখানে মার্ডারের সমাধান করবে আর ওদিকে হীরের গল্প সমাধান করবে অন্য কেও। খবর পেলাম ব্যোমকেশ আমাদেরই কমপ্লেক্সে আসছে হীরে চুরির রহস্য সমাধানে। কোনদিনও কল্পনাও ভাবতে পারিনি যে চোখের সামনে ফেলুদা, জটায়ু ও ব্যোমকেশ, অজিতকে দেখব।
মোটামুটি কেসটা বুঝলো কি না বুঝলামনা, তবে দেখলাম এদিক-ওদিক একটু খোঁজখবর করে ওই টাইপের কাগজটা হাতে করে নিয়ে তারা বেরিয়ে গেল এবং পুলিশরা সেই মৃত দেহটাকে নিয়ে চলে গেল পোস্টমর্টেম করতে। বেরোতে যাবো হঠাৎ করে খবর চলে এলো যে ব্যোমকেশ বক্সী ও অজিত প্রবেশ করছে। আমি আর নিজেকে শান্ত না রাখতে পেরে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম আমি, দেখলাম সত্যি ব্যোমকেশ পরনে সাদা পাঞ্জাবি সাদা ধুতি চোখে একটা সোনালী রঙের চশমা আর হাতে একটি সিগারেট নিয়ে হেঁটে আসছে। ব্যোমকেশ হন্ততন্ত হয়ে হীরে চুরি যাওয়া কমপ্লেক্সের দিকে এগোতে থাকলো, তদের পিছু নিলাম আমিও l ব্যোমকেশ ও অজিত চারিদিক খোঁজ করতে লাগলো।ব্যোমকেশ এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করে কিছু না পেয়ে ফ্ল্যাটের নিচে নেমে এলেন, আমিও নিজেকে আটকে না রাখতে পেরে ব্যোমকেশের কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম যে আপনার সাথে আমি কথা বলতে চাই। বলেই শুরু করে দিলাম, বললাম আমাদেরই কমপ্লেক্সে একজন মার্ডার হয়েছে আর যিনি মার্ডার হয়েছেন তিনিও একজন ডায়মন্ড মার্চেন্ট। তো হতে পারে এই দুজনের মধ্যে কোন মিল আছে এটা শুনে ব্যোমকেশ বাবু আমাকে ধন্যবাদ বলে, আমার নাম জিজ্ঞেস করে চলে গেলেন। কিছু দিন পরেই দেখলাম ফেলুদা ও জটায়ু দৌড়ে দৌড়ে আমার ফ্ল্যাটের দিকে গেলেন, আমিও তাদের পিছু নিলাম আটকালাম, বললাম ফেলুদা দাঁড়ান আপনার সাথে কিছু কথা আছে। গিয়ে যে কথাগুলো আমি ব্যোমকেশকে বলেছিলাম সেই কথাগুলোই ফেলুদাকেও বললাম। সেই কথাটা শুনে ফেলুদা আবার ঘরে ঢুকে গেল। আমি বুঝলাম ফেলুদা এবং ব্যোমকেশ দুজনেই মাঠে নেমে পড়েছে তাদের রহস্যের সন্ধানে।
কিছুদিন পর মহা অষ্টমীর দিন সকাল-সকালই ঘুম থেকে উঠে পড়েছি উঠে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য যখন তৈরি হচ্ছিলাম, হঠাৎতই দেখলাম কলিংবেলে বাজছে, দরজা খুলে দেখলাম পরনে ধুতি পাঞ্জাবি হাতে সিগারেট স্বয়ং ব্যোমকেশ বক্সী দাঁড়িয়ে আছে। নমস্কার আমি ব্যোমকেশ বক্সী। আমি পুরো অবাক আমি তাড়াতাড়ি বললাম আসুন ব্যোমকেশ বাবু ভেতরে আসুন, সঙ্গে অজিত বাবুকেও ভেতরে আসতে বললাম। অজিত বাবু বলল, না না বসতে আসিনি আসলে আপনার কোন বন্ধুর মামা মারাগেছেন, দাদা তারই রুমে যেতে চাইছে, তো আপনি যদি নিয়ে যান। ব্যোমকেশ বাবু রুমে যাওয়া মাত্রই হঠাৎই পর্দার দিকে চোখ পড়েছিল, এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল পরদার দিকে। পর্দাটা সরিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে অজিতকে বললো, দেখ অজিত ওই যে ওই রুমটাতেই তো হীরে চুরি হয়েছে, আর দেখ রুমটা এই জানলার সোজা সুজি। আমি শুনে বললাম হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই বলছেন। হন্ততন্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন ব্যোমকেশ-অজিত, আর বের হতে হতে ব্যোমকেশ অজিতকে বলছিলেন বুঝে গেছি এই খুন কে করেছে রহস্যের সমাধান হয়ে গিয়েছে। অপরদিকে শুনলাম ফেলুদা এর জটায়ুও নাকি হীরে চুরির রহস্য সমাধান করে নিয়েছেন। কি ভাবছেন হঠাৎ কি করে এসব হলো? আরে বাবা আমি আছি তো। আমিই বুঝিয়ে বলছি শুনুন, আমার বন্ধুর ফ্ল্যাটে যিনি ছিলেন তিনি ছিলেন একজন ডায়মন্ড মার্চেন্ট তিনি ডায়মন্ড বিক্রি করতেন, তিনি এদিক-ওদিক দেশে এক্সপোর্ট করতেন, অপরদিকে যার হীরে চুরি গেছে তিনি মানে শ্যামবাবু হীরে কিনেছিল সমরেশের মামার কাছ থেকে। আসল ব্যাপারটা হলো যে, হীরে সমরেশের মামার থেকে শ্যামবাবু নিয়ে সমরেশের মামাকে কিছু মাসের মধ্যেই টাকা দিয়ে দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেলেও টাকা তিনি দিচ্ছিলেন না, তাই সমরেশের মামা অর্থাৎ সুনীলমামা তার কাছ থেকে জোরজাবস্তি করে হীরে টা নিয়ে আসে।
আর সেই জন্যই একদিন রাতে যখন শ্যামবাবু তার ঘর থেকে দেখলেন সুনিলমামা ঘরে বসে কিছু টাইপিং করছেন, শ্যামবাবু তখন তার কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে জানলা দিয়ে গুলি ছুড়লেন, যেটা সোজা গিয়ে সুনিলমামার মাথায় লাগলো আর তিনি সেখানেই মারা গেলেন। আর জানা গেল, যেই লেখাটা ফেলুদা নিয়ে গেছিল সেটা কিছুই ছিল না। আসলে সমরেশের মামা তার ভাগ্নের জন্য একটি হুইল বানাচ্ছিল। সেই হুইলে আসল লেখাটা তখনও কমপ্লিট হয়নি। আসলে শ্যামবাবু ভেবেছিলেন হীরে চুরির গল্প শুনিয়ে তিনি বেঁচে যাবেন। কিন্তু যেখানে ব্যোমকেশ ও ফেলুদা রহস্য সমাধানে নেমেছেন সেখানে তো সত্যের জয় অবধারিত।